Hot Posts

6/recent/ticker-posts

কোটা আন্দোলন ২০২৪’ কী শিক্ষা দিল

 ২০২৪ সালের আগে ২০১৮ সালেও সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন হয়েছিল। সেই আন্দোলনের পর কোটা পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়। কোটা নিয়ে আদালতের একটি রায়ের পর এবার নতুন করে আন্দোলন শুরু হয়। এবার কোটা আন্দোলন আমাদের কী শিক্ষা দিল, তা নিয়ে লিখেছেন এম এম আকাশ 



২০২৪ সালে কোটা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়

জাতীয় সংসদে সব রকম কোটা বাতিলের ঘোষণার পর ২০১৮ সালের অক্টোবরে যে নির্বাহী পরিপত্র জারি করা হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে ২০২১ সালে মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানেরা হাইকোর্টে একটি রিট করেন। হাইকোর্ট ২০২১ সালের ৬ ডিসেম্বর এই কোটা পরিবর্তনের পরিপত্রটিকে বাতিল করে দেন। ফলে সব ধরনের কোটা আবার পুনর্জীবিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়। সরকার এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করে। এই আপিল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে শুনানি হওয়ার প্রথম তারিখটি ঠিক হয় ৪ জুলাই।

সরকারের একটি নির্বাহী আদেশ বাতিল করা বা জারি রাখা সাধারণভাবে সরকারেরই সিদ্ধান্ত। মুক্তিযোদ্ধার সন্তানেরা আদালতে যাওয়ার আগেই সরকার নিজে অগ্রসর হয়ে কোটা একদম বাতিল না করে এর একটি যৌক্তিক সংস্কারের পদক্ষেপ নিতে পারত। কিন্তু এই ‘সহজ-সরল’ পথ না নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা ও আদালতের ওপর বিষয়টি ছেড়ে দেয়। তারা ছাত্রদের ক্ষোভের মাত্রা ও গভীরতা মোটেও বুঝতে পারেনি।

৪ জুলাই আদালত যখন শুনানি আরও এক মাস পিছিয়ে দিলেন, তখন ছাত্রদের আন্দোলন আরও তীব্রতর হতে থাকে। ৬ জুলাই কোটাবিরোধীরা অবশেষে সারা দেশে ‘বাংলা বন্ধের’ ডাক দেন। সড়ক-মহাসড়ক অবরোধ, পরীক্ষা বর্জন ও সাধারণ ছাত্রধর্মঘটের আহ্বান জানান। গত ১১ জুলাই ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, কোটাবিরোধীরা সর্বোচ্চ আদালতের বিরুদ্ধে যে শক্তি প্রদর্শন করছেন, তা বেআইনি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘শিক্ষার্থীরা লিমিট ক্রস করে যাচ্ছেন।’

এ রকম একটি নাজুক মুহূর্তে গত ১৪ জুলাই প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘কোটা বিষয়ে আমার কিছু করার নেই। ...মামলার পর আদালত যে রায় দেন, এতে নির্বাহী বিভাগের কিছু করার নেই। আদালতেই সমাধান হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা পাবে না, তাহলে কি রাজাকারের নাতি-পুতিরা পাবে?’

তাঁর এ বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধারণা হয়, প্রধানমন্ত্রী তাঁদের রাজাকার ‘ট্যাগ’ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলনে আরও অনেক কথা বলেন। ২০১৮ সালে প্রথম পর্যায়ের কোটাবিরোধী আন্দোলন সম্পর্কে বলেন, তিনি ‘বিরক্ত’ হয়ে কোটা বাতিল করে দিয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, কোটা বাতিল হলে কী হয়, সেটি দেখা।

তাঁর বক্তব্য অনুসারে তিনি এ সময় দেখতে পেয়েছেনবিসিএসে নারীরা বাদ পড়েছেন, ২৩টি জেলার কোনো নারী পুলিশে চাকরি পাননি ইত্যাদি। অবশ্য এসব কথায় আন্দোলনকারী ছাত্ররা হয়তো ভেবে থাকতে পারেন যে সংস্কার না হয়ে আগের ৫৬ শতাংশ অযৌক্তিক কোটাই হয়তো পুনরায় ফিরে আসতে যাচ্ছে।

১৪ জুলাই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের স্লোগান ওঠে, ‘আমি কে? তুমি কে? রাজাকার রাজাকার’। পরে তা বদলে হয়—‘চেয়েছিলাম অধিকার/ হয়ে গেলাম রাজাকার’, ‘আমি কে? তুমি কে? রাজাকার, রাজাকার/ কে বলেছে? কে বলেছে? সরকার, সরকার’। ক্ষেত্রবিশেষে সরকারের বদলে ‘স্বৈরাচার’ শব্দটিও শোনা গেছে।

এরপর আন্দোলনটি আর কোটার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকল না। সরকারের ভূমিকায় তা ভুলভাবে পরিণত হলো, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনুসারী’ বনাম ‘কোটা বাতিলের দাবিকারীদের’ মুখোমুখি সংঘাতে। এরপর ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে দেওয়া কিছু বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও উসকে দেয়।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, ‘আন্দোলন থেকে আত্মস্বীকৃত রাজাকার ও তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ মানসিকতা বা আচরণের প্রকাশ ঘটেছে। এর জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত।’ তাঁর এ ধরনের দাম্ভিকতাপূর্ণ বক্তব্য ছিল অগ্রহণযোগ্য ও আত্মঘাতী। এর পাশাপাশি ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে যাঁরা ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান দিয়েছেন, তাঁদের শেষ দেখিয়ে ছাড়বেন। লক্ষণীয়, আন্দোলনকারীদের দাবির ক্ষেত্রে আইনের দোহাই দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ আইনের তোয়াক্কা না করে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার নামে কেন হামলার হুমকি দিয়েছিল?

এরপর ১৬ জুলাই সারা দেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। পাল্টাপাল্টি হামলা ও পুলিশের গুলিবর্ষণে ওই দিনই নিহত হন ৬ জন। আন্দোলনকারীদের কাছে শহীদের মর্যাদা পেয়ে যান রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ। সেই হত্যার ছবি প্রচারের ফলে আন্দোলন দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে যেতে শুরু করে। দলে দলে ছাত্র-জনতা পাড়ায়-মহল্লায় নেমে পড়ে।

অবশেষে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী ৮ মিনিটের জন্য একটি ভাষণ দেন। এ ভাষণের মূলকথা ছিল:

১. আন্দোলনকারীদের সর্বোচ্চ আদালতের রায় পাওয়া পর্যন্ত ধৈর্য ধারণ করতে হবে।

২. প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, তিনি বিশ্বাস করেন যে উচ্চ আদালতের কাছ থেকে ছাত্রসমাজ ন্যায়বিচার পাবে।

৩. ছয়জন নিহত হওয়ার ঘটনার জন্য একটি বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দেবেন।

কিন্তু কোটা আন্দোলনকারীরা সরকারের আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, শহীদের রক্ত মাড়িয়ে তাঁরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারবেন না। ১৯ জুলাই ৯ দফা ঘোষণা করে তাঁরা জানান, এই ৯ দফা দাবি না মানা পর্যন্ত ‘শাটডাউন’ অব্যাহত থাকবে। পরে দেখা যায়, তিন সমন্বয়ক মন্ত্রীদের সঙ্গে দেখা করে সংক্ষিপ্ত আকারে নতুন দাবির তালিকা পেশ করেন। এই দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:


Post a Comment

0 Comments